মধ্যপ্রাচ্য সংকটে অচল হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল

বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধাক্কা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনায় মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে। হরমুজে ঢুকলেই জাহাজ জ্বালিয়ে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান।

অন্যদিকে লোহিত সাগরে (রেড সি) জাহাজ চলাচল করলে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইয়েমেনের সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠী। পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশ্বের বড় কনটেইনার শিপিং লাইনগুলো বাব এল-মানদেব প্রণালি ও সুয়েজ খাল এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ পরিচালনা শুরু করেছে। ফলে এশিয়া-ইউরোপ রুটে ট্রানজিট টাইম বাড়বে ১০-১৪ দিন, বেড়েছে খরচও। এতে পুরো বিশ্বেই তৈরি হয়েছে ব্যয় বৃদ্ধির শঙ্কা।

পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাস পৌঁছার প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি। উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানিবাহী জাহাজ আগে হরমুজ পেরিয়ে আরব সাগরে প্রবেশ করে। এরপর এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যপথের জাহাজগুলো গালফ অব এডেন হয়ে বাব এল-মানদেব প্রণালি দিয়ে লোহিত সাগরে ঢোকে এবং পরে সুয়েজ খাল অতিক্রম করে ভূমধ্যসাগরে যায়; একই পথ উল্টোদিকেও চলে। ইউরোপ থেকে এশিয়াগামী জাহাজও সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগর পেরিয়ে বাব এল-মানদেব হয়ে ভারত মহাসাগরে নামে। অর্থাৎ পারস্য উপসাগর থেকে জ্বালানি রফতানির প্রথম গেটওয়ে হরমুজ। তবে ইরানের হুমকি ও হুথিদের হামলার ভয়ে জাহাজগুলো এখন হরমুজ ও লোহিত সাগর এড়িয়ে চলছে। ফলে সুয়েজ খাল করিডোরটিও অচল হয়ে পড়েছে। দুই করিডোরই ঝুঁকির মধ্যে থাকলে ‘কেপ অব গুড হোপ’ প্রচলিত বিকল্প পথ।

ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ায় মূলত সংকটের শুরু হয়। এ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। এমনকি আংশিক বা সাময়িক বাধাও সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক ও কাতারের অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে। ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, এ জলপথ দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে সেটিকে জ্বালিয়ে দেয়া হবে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সোমবার আইআরজিসির প্রধান কমান্ডারের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইব্রাহিম জাবারির এ বক্তব্য প্রকাশ করে। এরই মধ্যে হরমুজে অন্তত তিনটি ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে।

এদিকে সশস্ত্র হুথি গোষ্ঠী হুঁশিয়ারি দিয়েছে, লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের যেকোনো সামরিক জাহাজ ডুবিয়ে দেয়া হবে। তাদের এ হুমকি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিপিং রুটে সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। এরই মধ্যে কাতারের উৎপাদন বন্ধের পর ইউরোপে গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। কিন্তু এ অঞ্চলে সব রুটে এমন নিরাপত্তাহীনতা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে আরো তীব্র করতে পারে।

বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) কোম্পানিগুলোকে আহ্বান জানিয়েছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট জলসীমা দিয়ে চলাচল এড়িয়ে চলতে। এরই মধ্যে মায়েরস্ক, হ্যাপাগ-লয়েড ও সিএমএ, সিজিএমসহ প্রধান কনটেইনারবাহী কোম্পানিগুলো হরমুজ প্রণালি, লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল ও বাব এল-মানদেব প্রণালি এড়িয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ পরিচালনা শুরু করেছে। হুথিদের হামলার মুখে গত দুই বছরের বিঘ্নের পর কয়েক মাস আগে কিছু ক্যারিয়ার সতর্কভাবে লোহিত সাগর করিডোরে ফিরতে শুরু করেছিল। নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বাড়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবার খারাপের দিকে গেছে বলে কোম্পানিগুলো জানাচ্ছে।

এক বিবৃতিতে ডেনমার্কভিত্তিক মায়েরস্ক জানিয়েছে, অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তারা আপাতত বাব এল-মানদেব প্রণালি হয়ে ভবিষ্যৎ ট্রান্স-সুয়েজ যাত্রা স্থগিত রাখবে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূলে এলে আবার ট্রান্স-সুয়েজ রুটকে অগ্রাধিকার দেবে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছে যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও কাতারে তাদের সেবাও বিঘ্নিত হতে পারে।

জার্মান লাইন হ্যাপাগ-লয়েড জানিয়েছে, তারা তাদের ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, ভূমধ্যসাগরীয় আইএমএক্স সেবা পরিচালনা করবে দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরিয়ে। নিরাপদ যাত্রা সম্ভব হলে আগের রুট ফিরিয়ে আনবে। পাশাপাশি আপার গালফ, অ্যারাবিয়ান গালফ ও পারস্য গালফে যাওয়া-আসা করা কার্গোর ওপর যুদ্ধঝুঁকি সারচার্জ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি, যা গত সোমবার থেকে কার্যকর হয়েছে।

ফরাসি গ্রুপ সিএমএ সিজিএম জানিয়েছে, তারা ইরাক, বাহরাইন, কুয়েত, ইয়েমেন, কাতার, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, জিবুতি, সুদান, ইরিত্রিয়া ও মিসরের লোহিত সাগর বন্দরসংশ্লিষ্ট চালানে জরুরি সংঘাত সারচার্জ আরোপ করবে। প্রতিষ্ঠানটি সুয়েজ খাল দিয়ে চলাচল স্থগিত করেছে এবং জাহাজ আফ্রিকা ঘুরিয়ে দিচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম কনটেইনার লাইনগুলোর একটি মেডিটেরেনিয়ান শিপিং কোম্পানি (এমএসসি) জানিয়েছে, তারা পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যগামী সব কার্গো বুকিং স্থগিত করছে। উপসাগরে থাকা বা সেখানে যাত্রারত জাহাজগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

শিপিং অ্যাসোসিয়েশন বিআইএমসিওর প্রধান নিরাপত্তা ও সুরক্ষা কর্মকর্তা জ্যাকব লারসেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা উপসাগর ও আশপাশে জাহাজ পরিচালনার ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়েছে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলি স্বার্থের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা জাহাজগুলোর ঝুঁকি বাড়তে পারে, তবে অন্য জাহাজও ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে আঘাতের শিকার হতে পারে।

লোহিত সাগর ঘিরে উদ্ভূত অস্থিরতার কারণে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যেও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কেননা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রগামী তৈরি পোশাক রফতানির বড় অংশই সুয়েজ খালনির্ভর। ফলে এ রুটে বিঘ্ন ঘটলে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হবে। এতে ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়তে পারে এবং অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় রফতানিকারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমস্যা ঘনীভূত হবে তো বটেই। রেড সির কারণেই এখন সুয়েজ খাল দিয়ে যাতায়াত বন্ধ হয়েছে। এর আগেও একবার এ পরিস্থিতি দেখা দিয়েছিল। তখন কেপটাউন দিয়ে ভারত সাগর হয়ে আটলান্টিক ঘুরে যেতে হতো। ওই সময়ে ফ্রেইট চার্জ (পরিবহন খরচ) বেড়ে গিয়েছিল বহুগুণ। এখনো সে আশঙ্কা করছি।’

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো কনসাইনমেন্টকে ওই দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হয়নি বলে আমরা জেনেছি। তবে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আগামী দুই-একদিনের মধ্যে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’

আরও